হযরতে সাইয়েদেনা ওয়াইসুল কারনি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু যার প্রেমের মামলায়


হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ): ইশকে রাসূল বা নবী প্রেমের এক অমর উপাখ্যান
 হযরতে ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক মহামানব এসেছেন, যাদের জীবন, ত্যাগ এবং স্রষ্টা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা বিশ্ববাসীর জন্য চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা। তবে যখনই ‘ইশকে রাসূল’ বা নবীজির (সাঃ) প্রতি নিঃস্বার্থ, নিঃশর্ত এবং দূরদর্শী প্রেমের কথা আসে, তখন সবার আগে যে নামটি শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন হযরত সাইয়েদেনা ওয়াইস করনী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)। তিনি সাহাবী ছিলেন না, কারণ তিনি সরাসরি নবীজিকে (সাঃ) দেখার সৌভাগ্য লাভ করেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন ‘তাবেয়ীদের সরতাজ’ বা শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী। তাঁর প্রেম ছিল এতই গভীর যে, মদিনা থেকে শত শত মাইল দূরে ইয়েমেনে বসেও তিনি নবীজির (সাঃ) হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করতেন। 

নিচে এই মহান প্রেমিকের জীবনের এক বিস্তৃত, আবেগঘন এবং অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী তুলে ধরা হলো।


 প্রাথমিক জীবন ও প্রেক্ষাপট


ইয়েমেনের এক বিস্তীর্ণ মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত ‘করন’ নামক এক ছোট্ট গ্রাম। এই গ্রামেই জন্ম গ্রহণ করেন ওয়াইস ইবনে আমির আল-করনী (রাঃ)। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। শৈশবেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান। পরিবারে বলতে ছিলেন কেবল তাঁর বৃদ্ধা, অন্ধ এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা। 


ওয়াইস করনী (রাঃ) দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধা। তাঁর শরীরে শ্বেতী রোগ ছিল। পরে আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে তাঁর রোগ সেরে যায়, শুধু নবীজির (সাঃ) নির্দেশিত একটি রূপার মুদ্রার সমপরিমাণ দাগ তাঁর কাঁধের কাছে রয়ে গিয়েছিল, যা তাঁর পরিচয়ের একটি নিদর্শন ছিল। তিনি মানুষের মেষ চরাতেন এবং এর বিনিময়ে যা সামান্য পারিশ্রমিক পেতেন, তা দিয়ে নিজের এবং মায়ের ভরণপোষণ করতেন। 


সমাজের মানুষ তাঁকে বড্ড অবহেলা করত। কেউ তাঁকে বলত পাগল, কেউবা তাঁকে নিয়ে উপহাস করত। কিন্তু এই তথাকথিত 'পাগল' মানুষটির বুকের ভেতর যে এক অনন্ত প্রেমের মহাসাগর ঢেউ খেলছিল, তা আরবের ওই সাধারণ মানুষগুলো বুঝতে পারেনি। তাঁর দিন কাটত মেষ চরিয়ে আর মায়ের খেদমত করে, আর রাত কাটত মহান রবের সিজদায় এবং তাঁর প্রিয় হাবিবের (সাঃ) প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করে।


দূর থেকে দেখা না-দেখা প্রেমের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন


মক্কায় যখন ইসলামের সূর্য উদিত হলো এবং মদিনায় যখন সেই আলো ছড়িয়ে পড়ল, তখন ইয়েমেনের করন গ্রামে বসেই ওয়াইস করনী (রাঃ) সেই আলোর ছটা অনুভব করলেন। তিনি লোকমুখে শুনেছিলেন যে, আরবের বুকে একজন নবী এসেছেন, যিনি সত্যের পথে ডাকেন, যিনি মানুষের প্রতি দয়ালু, যার চরিত্র কুরআনের বাস্তব রূপ। নবীজির (সাঃ) চেহারা মোবারক তিনি কখনো দেখেননি, কিন্তু তাঁর অন্তরের চোখে তিনি নবীজিকে (সাঃ) ঠিকই দেখতে পেতেন। 


প্রেমের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্থান-কালের সীমানা মানে না। ওয়াইস করনী (রাঃ)-এর অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি ইয়েমেনের মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে মদিনার দিকে মুখ করে কাঁদতেন। বাতাস যখন উত্তর দিক থেকে বইত, তিনি বুক ভরে শ্বাস নিতেন। তিনি বলতেন, "আমি এই বাতাসে আমার প্রিয়নবীর সুবাস পাচ্ছি।" 


তাঁর হৃদয়ে দিনরাত কেবল একটিই আকাঙ্ক্ষা—কবে তিনি তাঁর প্রিয়নবীকে (সাঃ) এক নজর দেখবেন। কিন্তু তাঁর পায়ে ছিল এক অদৃশ্য শেকল, আর তা হলো তাঁর অন্ধ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মায়ের দায়িত্ব। মা তাঁকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারতেন না। মায়ের সেবা করা আল্লাহর নির্দেশ, আর রাসূলকে (সাঃ) দেখা তাঁর হৃদয়ের একান্ত চাওয়া। এই দুইয়ের মাঝে তিনি এক অপূর্ব ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন।


ওহুদের যুদ্ধ এবং প্রেমের এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত


নবীজির (সাঃ) প্রতি ওয়াইস করনীর (রাঃ) ভালোবাসা কেমন ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ওহুদ যুদ্ধের সময়কার এক ঘটনায়। 


মদিনার প্রান্তরে তখন ওহুদের যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে কাফেরদের আঘাতে নবীজির (সাঃ) একটি দান্দান মোবারক (দাঁত) শহীদ হয়ে যায়। মদিনা থেকে ইয়েমেনের দূরত্ব অনেক, কিন্তু প্রেমের যোগাযোগের কোনো তার লাগে না। ইয়েমেনে বসে ওয়াইস করনী (রাঃ) হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলেন। লোকমুখে খবর এলো যে, ওহুদের প্রান্তরে নবীজির (সাঃ) দাঁত শহীদ হয়েছে। 


এই খবর শোনামাত্র ওয়াইস করনী (রাঃ) অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর চোখে অঝোর ধারায় পানি। তিনি ভাবলেন, "আমার প্রিয়নবীর দাঁত শহীদ হয়েছে, আর আমি ওয়াইস আমার দাঁত নিয়ে সুখে খাবার চিবিয়ে খাব? এ কেমন প্রেম!" 


তিনি একটি পাথর হাতে নিলেন। কিন্তু তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, নবীজির (সাঃ) ঠিক কোন দাঁতটি শহীদ হয়েছে? ওপরের, নাকি নিচের? ডান দিকের, নাকি বাম দিকের? তিনি তো জানেন না। যদি তিনি তাঁর নিজের একটি দাঁত ভাঙেন, আর পরে জানতে পারেন নবীজির (সাঃ) অন্য দাঁতটি ভেঙেছে, তবে তো প্রেমের হক আদায় হলো না। এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় এবং ইশকের চরম উন্মাদনায় তিনি পাথর দিয়ে আঘাত করে নিজের একটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। তবু তাঁর মন শান্ত হলো না। এভাবে তিনি একে একে তাঁর মুখের ৩২টি দাঁতই ভেঙে ফেললেন! 


ইতিহাসে প্রেমের এমন আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি আর নেই। দাঁতবিহীন ওয়াইস করনী (রাঃ) যখন কথা বলতেন, তখন মানুষ অবাক হয়ে যেত। কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁর প্রেমাস্পদের ব্যথায় সমব্যথী হওয়ার শান্তিতে মগ্ন।


মদিনার পানে যাত্রা: এক অসমাপ্ত মিলন


দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। নবীজিকে (সাঃ) দেখার তৃষ্ণা ওয়াইস করনীর (রাঃ) হৃদয়ে দাবানলের মতো জ্বলতে থাকে। একদিন তিনি আর সহ্য করতে না পেরে তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। 


"মা, আমার প্রাণ যে আর মানে না। প্রিয়নবীকে (সাঃ) দেখার জন্য আমার হৃদয় ফেটে যাচ্ছে। আপনি আমাকে শুধু একবার মদিনায় যাওয়ার অনুমতি দিন। আমি তাঁকে এক নজর দেখেই ফিরে আসব।"


মা তাঁর ছেলের এই ব্যাকুলতা বুঝতেন। কিন্তু তিনি নিজে ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায়। তবুও ছেলের চোখের পানি দেখে মা আর না করতে পারলেন না। মা বললেন, "যাও বাবা ওয়াইস, আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম। তবে আমার একটি শর্ত আছে।"


ওয়াইস করনী (রাঃ) আনন্দিত হয়ে বললেন, "কী শর্ত মা? আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই মানব।"


মা বললেন, "তুমি সোজা মদিনায় যাবে। নবীজির হুজরায় (ঘরে) যাবে। যদি নবীজি ঘরে থাকেন, তবে তাঁর সাথে দেখা করে সাথে সাথে ফিরে আসবে। আর যদি তিনি ঘরে না থাকেন, তবে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না। কালক্ষেপণ না করে তখনই ইয়েমেনের পথ ধরবে। কারণ তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।"


মায়ের এই কঠিন শর্ত মেনে নিয়ে ওয়াইস করনী (রাঃ) মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। উত্তপ্ত বালুকা রাশি, দীর্ঘ মরুভূমির পথ—কোনো কিছুই তাঁর এই যাত্রাকে থামাতে পারল না। তাঁর পায়ে ফোসকা পড়ে গেল, শরীর ক্লান্ত হলো, কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল আনন্দে উদ্বেলিত। তিনি ভাবছিলেন, "আর কিছুক্ষণ পরেই আমি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় নবীজিকে (সাঃ) দেখতে পাব।"


অবশেষে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি মদিনায় পৌঁছালেন। সোজা চলে গেলেন নবীজির (সাঃ) হুজরা মোবারকের সামনে। বুক ধুকধুক করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজায় কড়া নাড়লেন। 


ভেতর থেকে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) অথবা হযরত ফাতেমা (রাঃ) [ভিন্ন বর্ণনায়] জানতে চাইলেন, "কে?"

ওয়াইস করনী (রাঃ) অত্যন্ত আদবের সাথে বললেন, "আমি ইয়েমেন থেকে এসেছি। আমি ওয়াইস। আমি কি আল্লাহর রাসূলকে (সাঃ) এক নজর দেখতে পারি?"


ভেতর থেকে উত্তর এল, "নবীজি তো এখন ঘরে নেই। তিনি মসজিদে নববীতে গেছেন (অন্য বর্ণনায়, কোনো এক সফরে গেছেন)। আসতে কিছুটা দেরি হবে। তুমি অপেক্ষা করো।"


এই কথাটি ওয়াইস করনীর (রাঃ) মাথায় যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। নবীজি ঘরে নেই! তাকে অপেক্ষা করতে হবে! কিন্তু তাঁর কানে বেজে উঠল তাঁর বৃদ্ধা মায়ের সেই কথা—"যদি নবীজি ঘরে না থাকেন, তবে কালক্ষেপণ না করে ফিরে আসবে।"


কী এক নিদারুণ পরীক্ষা! একদিকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনা, প্রাণের স্পন্দন, দুই জাহানের সর্দারকে দেখার সুযোগ; মাত্র কয়েক কদম দূরে মসজিদে গেলেই বা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই তাঁর দর্শন মিলবে। অন্যদিকে জন্মদাত্রী মায়ের আদেশ। 


ওয়াইস করনী (রাঃ) এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি বইতে লাগল। তিনি হুজরার দরজায় চুম্বন করলেন। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূলের পরিবার, তাঁকে আমার সালাম জানাবেন। তাঁকে বলবেন, ইয়েমেন থেকে এক হতভাগা ওয়াইস এসেছিল। কিন্তু মায়ের আদেশের কারণে সে অপেক্ষা করতে পারল না। সে ফিরে যাচ্ছে।"


এই বলে ওয়াইস করনী (রাঃ) মদিনার ধুলো মেখে, বুকভরা কষ্ট আর চোখের জল নিয়ে আবার ইয়েমেনের পথে পা বাড়ালেন। তিনি নবীজিকে (সাঃ) দেখলেন না, কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেলেন যে, মায়ের খেদমত এবং মায়ের আদেশের মর্যাদা কত বড়!


নবীজির (সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী ও জুব্বা মোবারক প্রদান


ওয়াইস করনী (রাঃ) চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই নবীজি (সাঃ) ঘরে ফিরলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি গভীরভাবে শ্বাস নিলেন। বললেন, "আমি আমার ঘরে ইয়েমেনের দিক থেকে আসা রহমানুর রাহিমের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। এখানে কে এসেছিল?"


পরিবারের সদস্যরা জানালেন, "ইয়েমেন থেকে ওয়াইস নামের এক পাগলপ্রায় লোক এসেছিল। সে আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল, কিন্তু মায়ের আদেশের কারণে অপেক্ষা না করেই ফিরে গেছে।"


নবীজি (সাঃ) মুচকি হাসলেন। তাঁর চোখেও ভালোবাসার অশ্রু। তিনি তাঁর সাহাবীদের ডাকলেন এবং ওয়াইস করনীর (রাঃ) মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, "ওয়াইস তাবেয়ীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সে তার মায়ের এত বড় অনুগত যে, আল্লাহ তার যেকোনো দোয়া কবুল করেন।"


নবীজি (সাঃ) তাঁর ইন্তেকালের আগে হযরত ওমর (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে তাঁর নিজের একটি পবিত্র জুব্বা মোবারক (পোশাক) তাঁদের হাতে দিলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, "আমার ইন্তেকালের পর তোমরা ইয়েমেনে যাবে। সেখানে ওয়াইস করনীকে খুঁজবে। তাকে আমার সালাম পৌঁছে দেবে এবং আমার এই জুব্বাটি তাকে পরিয়ে দেবে। আর তাকে বলবে, সে যেন আমার উম্মতের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। কারণ আল্লাহ ওয়াইসের সুপারিশে রবীয়া ও মুযার গোত্রের মেষের পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেবেন।" (রবীয়া ও মুযার ছিল আরবের সবচেয়ে বড় মেষপালক গোত্র)।


জুব্বা হস্তান্তর এবং উম্মতের জন্য ওয়াইসের কান্না


নবীজির (সাঃ) ইন্তেকালের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। হযরত ওমর (রাঃ) তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। কিন্তু তাঁর মনে নবীজির (সাঃ) সেই নির্দেশ সর্বদা ঘুরপাক খেত। প্রতি বছর হজের সময় ইয়েমেন থেকে কাফেলা আসলে ওমর (রাঃ) তাদের কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকতেন, "তোমাদের মধ্যে কি ওয়াইস করনী নামে কেউ আছে?"


সবাই বলত, না। 


অবশেষে এক বছর ইয়েমেনের এক কাফেলার কাছে গিয়ে ওমর (রাঃ) একই প্রশ্ন করলেন। কাফেলার একজন বলল, "হে আমিরুল মুমিনীন, ওয়াইস নামে আমাদের গ্রামে একজন আছে বটে, কিন্তু সে তো একটা পাগল। সে লোকালয়ে থাকে না, মরুভূমিতে মেষ চরায়। সে আপনার মতো খলিফার সাথে দেখা করার যোগ্য নয়।"


হযরত ওমর (রাঃ) ধমক দিয়ে বললেন, "তাকে পাগল বোলো না! সে-ই তো সেই মহামানব যাকে আমি খুঁজছি।"


হযরত ওমর (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ) মক্কার অদূরে আরাফাতের ময়দানের কাছে (বা ইয়েমেনের পথে) ওয়াইস করনীকে (রাঃ) খুঁজতে বের হলেন। তাঁরা দেখলেন, এক জীর্ণশীর্ণ ব্যক্তি, গায়ে পুরোনো কাপড়, মরুভূমিতে মেষ চরাচ্ছে আর নামাজে সিজদাবনত হয়ে কাঁদছে।


তাঁরা কাছে গিয়ে সালাম দিলেন। ওয়াইস করনী (রাঃ) সালামের উত্তর দিলেন। 

ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার নাম কী?"

তিনি উত্তর দিলেন, "আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা)।"

ওমর (রাঃ) বললেন, "আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। আপনার মায়ের দেওয়া নাম কী?"

তিনি বললেন, "ওয়াইস।"


ওমর (রাঃ) তাঁর কাঁধের কাছে সেই শ্বেতী রোগের নিরাময় হওয়া একটি মুদ্রার সমান দাগ দেখতে পেলেন এবং নিশ্চিত হলেন যে ইনিই সেই ওয়াইস করনী। 


ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) বললেন, "আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং এই জুব্বা মোবারক পাঠিয়েছেন। তিনি আপনাকে উম্মতের জন্য দোয়া করতে বলেছেন।"


নবীজির (সাঃ) সালাম আর জুব্বার কথা শুনে ওয়াইস করনী (রাঃ) মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তিনি জুব্বাটি হাতে নিয়ে একটু দূরে চলে গেলেন। মাটিতে সিজদায় পড়ে আল্লাহকে বলতে লাগলেন, "হে আল্লাহ! আপনার হাবিব আমাকে তাঁর জুব্বা পাঠিয়েছেন এবং উম্মতের জন্য দোয়া করতে বলেছেন। হে দয়াময়, আমি ওয়াইস এই জুব্বা শরীরে জড়াবো না, যতক্ষণ না আপনি মোহাম্মদ (সাঃ)-এর সমস্ত উম্মতকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন।"


দীর্ঘক্ষণ তিনি সিজদায় পড়ে রইলেন। এক পর্যায়ে ওমর (রাঃ) ও আলী (রাঃ) কাছে গেলে তিনি মাথা তুলে বললেন, "আপনারা কেন এলেন? আল্লাহ তো নবীজির উম্মতের এক বিশাল অংশকে আমার দোয়ার বরকতে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনারা না আসলে আমি সমস্ত উম্মতের ক্ষমার প্রতিশ্রুতি নিয়েই উঠতাম।"


এরপর তিনি অত্যন্ত আদব ও ভালোবাসার সাথে নবীজির (সাঃ) সেই জুব্বা মোবারক পরিধান করলেন। হযরত ওমর (রাঃ) খলিফা হওয়া সত্ত্বেও ওয়াইস করনীর (রাঃ) আধ্যাত্মিক মর্যাদা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং তাঁর কাছে দোয়া চাইলেন। ওয়াইস করনী (রাঃ) বললেন, "আমি তো প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর সকল মুমিন মুমিনাতের জন্য দোয়া করি, আপনিও তার মধ্যে শামিল আছেন।"


শেষ জীবন ও শাহাদাত


ওয়াইস করনী (রাঃ) কখনোই দুনিয়ার খ্যাতি বা নামডাক চাননি। যখন লোকেরা তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে জানতে পারল, তখন মানুষ তাঁর কাছে ভিড় করতে শুরু করল। মানুষের এই ভিড় এবং সম্মান তাঁর ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। তাই তিনি তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ইয়েমেন ছেড়ে ইরাকের কুফায় চলে যান, যাতে মানুষ তাঁকে চিনতে না পারে এবং তিনি গোপনে তাঁর রবের ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারেন।


জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফতের সময় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। সিফফিনের যুদ্ধে (মতান্তরে অন্য কোনো যুদ্ধে) তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর পক্ষে ন্যায়ের জন্য লড়াই করেন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। 


কথিত আছে, তাঁর শাহাদাতের পর একাধিক গোত্র তাঁর পবিত্র মৃতদেহ দাফন করার জন্য দাবি জানায়। কিন্তু এক অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয় এবং আল্লাহ তাঁর এই প্রিয় প্রেমিককে নিজের কাছে তুলে নেন।


ওয়াইস করনীর (রাঃ) জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা


হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ)-এর এই দীর্ঘ ও আবেগময় জীবনী কেবল একটি গল্প নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল পাঠশালা। তাঁর জীবন থেকে আমরা মূলত তিনটি প্রধান শিক্ষা পাই:


১. বিশুদ্ধ প্রেম বা ইশকে রাসূল (সাঃ):ভালোবাসা চোখের দেখার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে হৃদয়ের অনুভবের ওপর। ওয়াইস করনী (রাঃ) প্রমাণ করেছেন, নবীজিকে (সাঃ) না দেখেও তাঁর সুন্নাতকে ভালোবেসে, তাঁর প্রতি দরুদ পড়ে এবং তাঁর ব্যথায় ব্যথিত হয়ে সর্বোচ্চ স্তরের সাহচর্য বা আধ্যাত্মিক নৈকট্য লাভ করা সম্ভব।


২. মায়ের খেদমত:

জান্নাত যে মায়ের পায়ের নিচে, ওয়াইস করনী (রাঃ) তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নবীজিকে (সাঃ) দেখার মতো বিশাল সুযোগ তিনি ত্যাগ করেছিলেন কেবল মায়ের একটি আদেশের কারণে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এই ত্যাগকে এতই পছন্দ করেছিলেন যে, তাঁকে তাবেয়ীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরানো হয়েছিল। 


৩. দুনিয়াবিমুখতা ও বিনয়

নবীজির (সাঃ) কাছ থেকে জুব্বা পাওয়ার পরও ওয়াইস করনী (রাঃ) অহংকার করেননি। তিনি মানুষের ভিড় থেকে দূরে পালিয়েছেন আল্লাহর সাথে একাগ্রতা বজায় রাখার জন্য। তাঁর এই বিনয়ই তাঁকে আল্লাহর কাছে এত দামি করেছিল।


উপসংহার

হযরত ওয়াইস করনী (রাঃ) ছিলেন এমন এক প্রদীপ, যা দূর থেকে জ্বলেও ইসলামের মূল কেন্দ্র মদিনাকে আলোকিত করেছিল। তাঁর প্রেম ছিল নিঃস্বার্থ, তাঁর ভক্তি ছিল প্রশ্নহীন এবং তাঁর ত্যাগ ছিল অতুলনীয়। যত দিন পৃথিবীতে ইসলাম থাকবে, তত দিন ইশকে রাসূলের (সাঃ) কথা এলে ওয়াইস করনীর (রাঃ) নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর প্রতি আল্লাহর কোটি কোটি রহমত বর্ষিত হোক এবং আল্লাহ আমাদের হৃদয়েও নবীজির (সাঃ) প্রতি এমন খাঁটি ভালোবাসা এবং পিতামাতার প্রতি এমন ভক্তি সৃষ্টি করে দিন। আমিন। 


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post