ইসলামী দৃষ্টিতে প্রবাসী সন্তানের অপেক্ষায় মৃতদেহ ফ্রিজে সংরক্ষণ: একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা

 ইসলামী দৃষ্টিতে প্রবাসী সন্তানের অপেক্ষায় মৃতদেহ ফ্রিজে সংরক্ষণ: একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা


 ভূমিকা


বর্তমানে বাংলাদেশে একটি প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে — কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার প্রবাসী ছেলেমেয়েদের আসার অপেক্ষায় এক দিন, দুই দিন, এমনকি তারও বেশি সময় ধরে মৃতদেহ ফ্রিজে বা হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের আবেগ ও মায়া-মমতার দিক থেকে বিষয়টি বোধগম্য হলেও ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।


 ইসলামে দাফনের তাড়াহুড়োর নির্দেশ


ইসলামী শরীয়তে মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করার ব্যাপারে স্পষ্ট এবং জোরালো নির্দেশনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:


তোমরা জানাযার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করো। কেননা সে যদি নেককার হয়, তাহলে তোমরা তাকে কল্যাণের দিকে এগিয়ে দিচ্ছ। আর যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে তোমরা একটি মন্দ জিনিসকে তোমাদের ঘাড় থেকে নামিয়ে রাখছ।"** (সহীহ বুখারী: ১৩১৫, সহীহ মুসলিম: ৯৪৪)


এই হাদীসটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, মৃতদেহের গোসল, কাফন, জানাযা এবং দাফন — সবকিছু দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা উচিত। বিলম্ব করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী।


 সাহাবীদের আমল ও ইসলামী ঐতিহ্য


ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মৃত্যুর পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দাফনকার্য সম্পন্ন করতেন। হযরত আবু বকর (রা.) ইন্তেকালের পর সেই রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়। অনেক সাহাবী যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করলে যুদ্ধের দিনই তাঁদের দাফন করা হতো। কোনো সাহাবীর দাফনে এক-দুই দিন বিলম্ব করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল এবং তা শুধুমাত্র অপরিহার্য কারণেই ঘটেছিল।


 বিলম্বে দাফনের শরীয়ত সম্মত কারণ ও অসম্মত কারণ


ইসলামী ফিকহবিদগণ কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দাফনে সামান্য বিলম্বের অনুমতি দিয়েছেন। যেমন:


মৃত্যু নিশ্চিত করা কেউ সত্যিই মারা গেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য সামান্য অপেক্ষা।

গোসল, কাফন ও জানাযার প্রস্তুতিএসবের জন্য স্বাভাবিক সময় প্রয়োজন।

আইনগত বাধ্যবাধকতা:** ময়নাতদন্ত বা পুলিশি তদন্তের প্রয়োজনে।

জানাযায় অধিক মুসল্লির অংশগ্রহণ: নিকটবর্তী এলাকার মানুষদের জানাযায় শরিক হওয়ার জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করা।


তবে এই বিলম্ব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রবাসী সন্তানদের আসার জন্য এক-দুই দিন বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করা ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় না।


মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান ও অবমাননা


ইসলামে মৃত ব্যক্তির শরীরের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:


মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার মতোই (গুনাহের দিক থেকে)। (আবু দাউদ: ৩২০৭)


মৃতদেহকে দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রেখে দেওয়া, যদিও বাহ্যিকভাবে শরীরের ক্ষয় রোধ করে, কিন্তু এটি মৃত ব্যক্তির মর্যাদার পরিপন্থী। মৃত ব্যক্তির রূহ তার দেহের সাথে একধরনের সম্পর্ক রাখে — এই অবস্থায় দেহকে ঠান্ডা হিমাগারে আটকে রাখা মৃতের আত্মার জন্যও কষ্টদায়ক হতে পারে বলে আলেমগণ মত প্রকাশ করেছেন।


 আবেগ বনাম শরীয়তের বিধান


অনেক পরিবার আবেগতাড়িত হয়ে মনে করেন যে, ছেলেমেয়েরা শেষ দেখা না দেখলে তাদের মনে কষ্ট থাকবে, মাতা-পিতার প্রতি অকৃতজ্ঞতা হবে। এই আবেগ অবশ্যই সম্মানযোগ্য, কিন্তু ইসলামে আবেগের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অগ্রগণ্য।


আল্লাহ তা'আলা বলেন:


কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর জন্য সংগত নয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে সে বিষয়ে তাদের নিজেদের কোনো ইখতিয়ার থাকবে।"** (সূরা আহযাব: ৩৬)


মৃত মাতা-পিতার প্রতি প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাঁদের জন্য দোয়া করা, ইসতিগফার করা, সদকা-জারিয়াহ করা — শেষ দেখা দেওয়া নয়। প্রবাসী সন্তান যদি সময়মতো আসতে না পারে, তাহলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করাই তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান।


 ফ্রিজে সংরক্ষণের শরীয়ত সম্মত মূল্যায়ন


ফ্রিজে বা মর্গে মৃতদেহ সংরক্ষণ আধুনিক যুগের একটি উদ্ভাবন। এটি নিজে হারাম নয়, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিই সমস্যার মূল। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ও শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে দাফনে বিলম্ব করার উদ্দেশ্যে ফ্রিজে রাখা গুনাহের কাজ বলে অধিকাংশ আলেমগণ ফতোয়া দিয়েছেন। কারণ:


প্রথমত,এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট নির্দেশের বিরোধী।

দ্বিতীয়ত, এতে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।

তৃতীয়ত,এটি অনারব ও অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণ।

চতুর্থত, এতে অতিরিক্ত খরচ হয় যা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।


 সমাজে এই প্রবণতার কারণ ও প্রতিকার


এই প্রবণতার মূল কারণ হলো দীনি ইলমের অভাব, আবেগের অতিরিক্ত প্রভাব, সামাজিক চাপ এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব। প্রতিকারের জন্য:


১. মসজিদের ইমাম ও খতিবগণকে** জুমার খুতবায় এবং ওয়াজ-নসিহতে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

২. পরিবারের সদস্যদের ইসলামের বিধান সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত রাখতে হবে।

৩. প্রবাসী সন্তানদের বুঝতে হবে যে, মাতা-পিতার জন্য সর্বোত্তম কাজ হলো তাঁদের দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা এবং পরবর্তীতে দোয়া ও নেক আমল দ্বারা তাঁদের রূহে সওয়াব পৌঁছানো।

৪. সামাজিক নেতৃবৃন্দকেএই ভুল প্রবণতা রোধে ভূমিকা রাখতে হবে।


 উপসংহার


ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা যেখানে জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মৃতদেহ প্রবাসী সন্তানদের আসার অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রেখে দাফনে বিলম্ব করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত এবং গুনাহের কাজ। আমাদের উচিত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনা মেনে চলা। প্রবাসী সন্তান কবর জিয়ারত করে, দোয়া করে এবং নেক আমলের মাধ্যমে মৃত মাতা-পিতার জন্য অনেক বেশি উপকার করতে পারেন, যা ফ্রিজে রেখে শেষ দেখা দেওয়ার চেয়ে বহুগুণ উত্তম। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

إرسال تعليق (0)
أحدث أقدم